রওজাত তাহানিয়া
আমি এখানকার নই, কারণ না কেউ আমায় বুঝতে পারে, না আমি কাউকে। ওরা বোঝেনা যে আমার পিয়ানো বাদে কিছুর প্রয়োজন নেই। আমি যখনই পিয়ানো বাজাই সে আসে। আসবেই। তার সাথেই এত গল্প হয়, আমার আর কারো প্রয়োজন হয় না। সে আমার পিয়ানো বাজানো শুনতে ভালোবাসে, আর কেউ বাসেনা।
আমি ছোটবেলা থেকেই পিয়ানো বাজাই। যেদিন থেকে তার সাথে কথা হয়, আর কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগেনা, এবং গত কয়দিন যাবত বলিও নি। পাঁচ দিন, সাত দিন? মনে নেই।
আমাদের মুখে মুখে কথা হয়না অবশ্য, পিয়ানোর ‘কি’ প্রেস করার মাধ্যমে হয়। এ বাদে কথোপকথন সম্ভব নয় আসলে, পিয়ানো বাজাতেই হয়।
***
“সারাদিনই কম্পিউটারের সামনে বসে থাকো?”
“কম্পিউটার কখন ধরতে দেখলে, দেখ না আমি তোমাকে শোনানোর জন্য শুধু পিয়ানো বাজাই?”
“তোমার জোক গুলো খুব উইয়ার্ড, আগামাথা কিছুই বুঝিনা।”
ও কেন ভাবলো আমি মশকরা করছি? ওর কি আমার পিয়ানো শুনতে ভালো লাগে না? আর কম্পিউটারের বিষয়টাও বুঝতে পারলাম না। কম্পিউটার তো দূরের কথা, পৃথিবীর কিছুই আমার কাছে এখন ম্যাটার করে না। আমি শুধু পিয়ানো বাজাই, আর যখন বাজাই না তখন বাজানোর কথা ভাবি। ভাবি যে তাকে কি শোনানো যায়, কি শোনালে সে আমায় ভালোবাসবে।
এর বাইরে আমার কোনো জগৎ নেই।
“পিয়ানো বাজানোই কি তোমার একমাত্র শখ?”
“হ্যাঁ…তবে গতকাল হায়ার স্টাডিজের জন্য ভাবছিলাম।”
“বাহ্! তা কী নিয়ে পড়াশোনা করবে, ভেবেছ?”
“মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং। আমার ইচ্ছে এমন হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করা যাদের পরিবেশন শিল্পকলা শেখানো যাবে। গান, নাচ, ভায়োলিন, পিয়ানো। মানুষের তৈরি রোবট মানুষের মতোই শিল্পী হবে, এটি ভাবতে চমৎকার লাগে।”
“রোবট পিয়ানো বাজাবে! কিন্তু সেটা তো তোমার কাজ।”
আমি এই বিষয়েও ভেবেছি। আমি পিয়ানো বাজানো ছেড়ে দিলে আমার তার সাথে আর কোনো দিন কথা হবে না।
কিন্তু আমি দেখতে চাই। আমি দেখতে চাই আমার সৃষ্টি করা এমন এক বস্তু যে কিনা শুধু পিয়ানোই বাজাবে আমার মতো। আমার জগতটা খুবই ক্ষুদ্র হয়ে এসেছে। এই ক্ষুদ্র জগতটাই আমি অন্য কারো হাতে তুলে দিতে চাই।
যদি কখনও সম্ভব না হয় রোবট বানানো, হয়তো আমি আমার পিয়ানোর কাছে ফিরে আসব।
সমাপ্তি
