By Rowzat Tahania
আমার জীবনে চেনা প্রথম চাকমা কেউ হল নিধি আপু। বড় আপুর সব থেকে কাছের বান্ধবি ছিল। আমাদের পারাবারিক দাওয়াত গুলতে প্রায় সে আসত। কয়েক বছর আগে রমজান মাসে এমনি এক ইফতারের দাওয়াতে সে আমাদের বাসায় এসেছিলো।
ইফতার হয়ে গিয়েছে বেশ খানিকক্ষণ আগে।এখন সবাই হয় বিশ্রাম, নয় আড্ডা, নয় তারাবীর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি আপুর পাশে গিয়ে বসলাম। আপু আমায় স্কুলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। পনেরো বছরের একটি মেয়ের সাথে বলতে গেলে স্কুল আর টুকটাক হবি বাদে বেশি কিছু থাকেনা আলাপ করার মত।
আমি কি মনে করে আপুকে মারিয়ামের কথা বলে ফেলি। মারিয়াম আমার ক্লাসমেট, এবং খুব ভাল বন্ধু। সমস্যাটা এখানে যে, আমার আর মারিয়ামের বন্ধুত্ব সাধারণ বন্ধুত্ব নয়।
“আমার গ্রামের বাড়িতে একটি মেয়ে ছিল। তোমার কথা শুনে তার কথা খুব মনে পরছে। সে আমাকে একবার বলেছিল, তার এক মেয়ে বন্ধু কে তার অনেক ভাল লাগতো। আমি বুঝতে পারি যে সে কুইয়ার, যেমন তুমি।”
এত অপেনলি কেউ আমাকে “কুইয়ার” বলে সম্বোধন করবে, এটা ভাবিনি। তবে শুনতে খারাপ লাগল না। প্রথমে একটু স্ট্রেঞ্জ শোনালো, কারন শব্দটি শুনে আমি অভস্ত নই। পরে মনেহল এই প্রথম আমি নিজেকে চিন্তে পারছি। যে কথা আমি নিজের পরিবার কিংবা বন্ধুদের বলিনি, আপুকে সেই কথা বলতে আমার দ্বিধা হল না।
“মেয়েটা এখন কেমন আছে? তোমাদের কথা হয় না?”
আপু অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
“ওদের গ্রাম পুরিয়ে ফেলা হয়েছে, কাঁকন।”
আমার ঘরের আলমারির দরজা পুরোটা খোলা। তবে সেটা আর আলমারি নেই, বরং বাহিরের দর্জা। দরজার ওপারে সারি ধরা অনেকগুলো পাহাড়ের চূড়া। কিছু বোঝার আগেই পা সেই অলৌকিক পাহাড়ে।
একটু হেঁটে সামনে যেতেই ছোট একটি নদী। এখনও আমি বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে। কোথায় এলাম, কি করে এলাম, পুরো বিষয়টাই অদ্ভুত। ভাবতে ভাবতেই কেউ একজন আমার পাশে এসে দাঁড়ায়।
“তুমি কি শহর থেকে এসেছ?”
তার উত্তর আমি দিতে পারলাম না। হয় আমি এতই অবাক ছিলাম যে কি বলব বুঝতে পারিনি, নাহয় আসলেই আমি ওই মুহুর্তে বোবা হয়ে গিয়েছিলাম।
“আমি শ্রেয়সী।”
তাও কিছু বলতে পারছি না। তবে শ্রেয়সী হয়তো কিছু মনে করেনি, শুধু হেঁটে গিয়ে নদীর পাশে যেয়ে বসলো। আমিও চুপচাপ তার পাশে গিয়ে বসলাম।
“বাড়ি যাবো না। মায়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে। তুমি জানো, তিথিকে আমি কত ভালোবাসি? মা তা ভাল চখে দেখেন না। আমাকে আর তিথিকে নিয়ে যতসব খারাপ মন্তব্য তার। আমি আর নিতে পারছি না এসব।”
আমি শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। শ্রেয়সীর মা কেন শ্রেয়সী আর তিথির বন্ধুত্ব খারাপ চখে দেখে সেটা কেউ বুঝবে কি না জানি না, তবে আমি বুঝতে পেরেছি। শ্রেয়সীকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না, কিন্তু তাও তাকে আমার খুব কাছের কোন বন্ধু বলে মনে হল।
এই পাহাড়েই আমার বাড়ি। সারা পাহাড়ের সবুজ আমার নাম ডাকছে। তার মদ্ধে রয়েছে শ্রেয়সী এবং আমার মত কিছু মানুষ।
এতক্ষণে সন্ধ্যা নেমে গেছে, আকাশও লাল হয়ে এসেছে। তখনই আমি দেখতে পেলাম, দূরে কোথায় জানি অনেকগুলো গাছের পিছে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।
